আমার স্পোর্টসের রেজাল্ট দেখে হয়তো বাবা ডি এন এ টেস্ট করানোর কথা ভেবেছিলেন...
শীতকাল এলেই পাড়ায় স্পোর্টস হবে। ফার্স্ট প্রাইজ মেডেল আর স্টিলের গামলা। সবাইকে কলা কমলালেবু কেক টিফিনে। সাইকেলের সামনের রডে বসিয়ে বাবা চললেন আমাকে রেসে নাম লেখাতে। দেওয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে হাইট মেপে গ্রুপ ভাগ। হিটে ফার্স্ট হয়ে উঠলাম। ফাইনাল রাউন্ডে প্রানপনে দৌড়াচ্ছি, এবারে সেকেন্ড...শেষের দিক থেকে। রডে বসে বাড়ি ফিরতে ফিরতে রিয়েলাইজ করেছিলাম টিফিনের কমলালেবুটা হেব্বি মিষ্টি।
বাবা হেব্বি স্পোর্টসম্যান, সব রেসে ফার্স্ট, চকচকে মেডেল, কাপ ভর্তি আলমারি, ঠাকুমা থেকে থেকে লেবু ঘষে ঘষে মাজে। লোকজনকে দেখানো হয়। আর আমি লজেন্স রেসে, সবচেয়ে লাস্টে পৌঁছে, দিদিদের বলি, "লজেন্স তো পেয়েছি"। হার্ডলসে হাঁটু দিয়ে বার ভেঙে দিলাম, হাই জাম্পের দড়ির নিচ দিয়ে দৌড়ে বেরিয়ে গেলাম, লং জাম্পে এমন করে লাফালাম যেন লং জাম্প নয়,কিত কিত খেলছি। একশো বা দুশো মিটারে আমি সাক্ষাত উসেইন বোল্ট,মানে ট্র্যাকে সবাই আমাকে ঠিক চিনতে পারতো " ওই দ্যাখ লাস্টে দৌড়াচ্ছে, ওটা বাবুদার ছেলে"। জীবনে একটামাত্র রেসে ফার্স্ট হয়েছি, স্লো সাইকেল রেস, যে সবচেয়ে লাস্টে পৌছাবে সে বিজয়ী,আমি সবার আগে ফিনিশিং লাইনে পৌঁছে মুচকি হেসে দেখতাম কে আগে সাইকেল থেকে পা মাটিতে ফেলছে।
বাড়ির লোকে বিশ্বাসই করেনি,অমন স্পোর্টসম্যান বাবার এই ছেলে হয়!লোকে ভাবতো টেকনিক্যাল এরর আছে,ছেলে নিশ্চই ফিনিশিং লাইন বুঝতে পারছে না। নদিদি কে রাখা হলো ফিনিশিং লাইনে,পই পই করে বলা হলো,"দিদি ঐ দড়িটার কাছে,গিয়ে ওকে ছুঁয়ে দিতে হবে,বাড়ির লোক,চিনতে পারবি?" আমি হ্যাঁআ বলে দৌড় লাগালাম, লেবু লজেন্স রেসের লজেন্স তুলতেই থতোমতো। দর্শকের মাঝে দাদাভাই,লাইনের পাশে 'বাড়ির লোক'...সব্বাই সোজা ছুটলো,আমি ট্র্যাক থেকে বাঁদিকে ছুটে দাদাভাই কে ছুঁয়ে 'ফার্স্ট হয়েছি' বলে সে কি লাফ।
থেকে থেকে গল্প শোনানো হতো, বাবা কিভাবে ছুটতো,কিভাবে সকাল থেকে প্র্যাকটিস করতো। কিভাবে ধাপে ধাপে স্পিড বাড়াতো। অন ইয়োর মার্ক শুনেই কিভাবে ঝুঁকে পিছনটা সোনার কেল্লার ঊটের মত আগে তুলতো, এসব শুনে উদ্দীপ্ত আমি পরদিন ভোর থেকেই রাস্তায় দৌড়,টানা প্র্যাকটিস করে কার্ল লুইস হবোই, তাতে ফলও হলো হাতে নাতে। তিন দিন ভোরে উঠে রাস্তায় দৌড়োতে দুদিন কুকুর তাড়লো, আর তার পরে মাথায় হিম বসে নিউমোনিয়া। জানলাম,পরিশ্রম কা কাফসিরাপ মিঠা হোতা হ্যায়।
তার মানে এই নয় যে আমি স্পোর্টস এ প্রাইজ পাই নি। "বাচ্ছা ছেলে দৌড়েছে প্রাইজ দিবি না?" পাড়ার অর্গানাইজার ছেলেদের সাথে রীতিমতো ঝগড়া করে একটা রবারের লাল নীল বল এনে দিয়েছিলো সেজোপিসি। তার মুখরক্ষা করে এনেছিলাম আমার প্রথম প্রাইজ,সাইকেল করে স্কুল থেকে ফিরছি,হাতে নতুন তোয়ালে,পিসির বাড়ি ক্রস করতে করতে চিতকার করে বললাম,প্রাইজ পেয়েছি পিসি, গো এজ ইউ লাইক, সান্তনা পুরস্কার...!!!!
আমাদের বাড়ি অবিশ্যি পুরুষাকারে বিশ্বাসী,খেলা মানে ফুটবল,প্রাইজ মানে ১০০,২০০ বা ৫০০ মিটার। আমার দৌড়, গো এজ ইউ লাইক অব্দি। পরের বার চ্যাপলিন সাজলাম। নিজের প্রিয় টুপিটার ভিতর পিচবোর্ড ঢুকিয়ে শেপ করা, কাজের দিদি আমার ব্যর্থতা দেখে দয়পরবেশ হয়ে ডোনেট করলেন নিজের চুল,গোঁফ এর সমস্যা মিটলো,পুরীর লাঠির সদ্ব্যবহার হলো,কিন্তু এত করেয়াও এখানেও প্রাইজ মিস হয়ে যেতো। চ্যাপলিন দেখেও কেউ হাততালি দেয় না,হঠাৎ কে একটা বললো, "ও চ্যাপলিন একটু পড়ো" মনে হলো,আমার পতন সর্বস্ব জীবন, ব্যস ধপাধপ পড়তে লাগলাম,গোটা মাঠ হাসছে,চরম হিউমিলিয়েশান,কিন্তু চ্যাপলিন পেলো সেকেন্ড প্রাইজ। কিন্তু মেডেল নেই, বগলে করে নিয়ে এলাম অ্যালবাম।
এর পর কুইজে,ডিবেটে বই পেয়েছি, সার্টিফিকেট পেয়েছি,কিন্তু ঐ পোডিয়ামে উঠে মেডেল গলায় ঝোলায়নি কেউ। তিতাসের স্পোর্টস দেখতে সেজে গুজে মাঠে গেলাম, ওর মা উত্তেজিত,"তুমি বাজে দৌড়োতে পারো,কিন্তু ওর মা ডিস্ট্রিক্ট এ স্পোর্টসে কোয়ালিফাই করা মেয়ে মনে রেখো",মনে রাখলাম, হার্ডলসে হিটে চ্যাম্পিয়ন, ফাইনাল রাউন্ডে মেডেল পাবেই, আমিও উত্তেজিত, আমার দুঃখ মেয়ে মোছাবে এই আশায়। হার্ডেলস এ তিতাস ফার্স্টে দৌড়াচ্ছে, হঠাৎ ঠাঁই ঠাঁই, হাঁটুর ধাক্কায় দুটো হার্ডল ধুপ ধাপ দু সাইডে।
এখন বাবা তিতাস কে শেখায়,অন ইয়োর মার্ক বললে কিভাবে পিছনটা তুলে রেডি হতে হয় সামনেটা ঝুঁকে,আমার গিন্নি বোঝায় ১০০,২০০ বা ৫০০ মিটার আসল, সোফায় শুয়ে আমি শুধু বলি,মাম্মা,হয়ে গেলে আয়,চার্লি চ্যাপলিনের মুভি দেখবো...