বুধবার, ২৪ অক্টোবর, ২০১৮

কার্নিভেল্ভেলেটা

বাঙালির বারো মাসে তেরো কার্নিভ্যাল। রেড রোডে দুর্গাপুজোর ভাসানের আগের কার্নিভ্যাল হোক বা চন্দননগরে জগধাত্রীর রোড শো, মানুষের ঢল হয়ে যায় ফুটন্ত দুধের মত,উপচে পড়বেই। তবে এ উতসব হ্যাংলামীর সাবসিডি শুধুমাত্র আমরাই নিয়ে আছি তা নয়, গোটা বিশ্বজুড়ে আমুদে মানুষজন প্রচুর,গুনতে ক্যালকুলেটরও ঐতিহাসিক ভুল করে বসবে।

বাঙালীর দেবতার গ্রাস, আর আমেরিকাতে মর্দি গ্রাস। বহুকাল আগে ব্যটম্যান আর রবিন এই মর্দি গ্রাসে গিয়ে কিছু গুন্ডা বদমাশকে শায়েস্তা করেছিল। মর্দি গ্রাস আসলে অন্তর থেকে বাংলা কার্নিভ্যাল,যেমন খুশি সাজো কম্পিটিশান,যাস্ট আমেরিকার কুম্ভ কি মেলে তে হারিয়ে গিয়ে মর্দি গ্রাস বলে পরিচিত হয়েছে। ২০১৮ তে ৩০০ বছর পূর্ন করা মর্দি গ্রাসের সূচনা ১৭শ খৃষ্টাব্দের ইউরোপে,তখন অবিশ্যি রাজপরিবারের মনসবদার ছিল এই উৎসব। এখন অবিশ্যি এই কার্নিভ্যালের সময়,মানে জানুয়ারী ৫ থেকে ১৩ই ফেব্রূয়ারী অব্দি একা রাজপরিবার নয়, সব্বাই ওয়েলকাম।

ওদিকে আবার কমলা কার্নিভ্যালে ডাক পেলেই ছুটতে হবে ইতালি। ইতালিতে কমলা উৎসব হয় শুনে গেরুয়া পার্টি ধরেই নিয়েছিল,রেড রোডের পালটা পাওয়া গ্যাছে।কিন্তু মুস্কিল হল সব ভক্তই কমলা,কিন্তু সব কমলাই ভক্ত নয়। ইতালিতে যে কমলা উৎসব হয় সেটা কমলালেবু ছুঁড়ে,এর সাথে পদ্মের সেরম সম্পর্ক নেই। মধ্যযুগে পাওনাগন্ডা আদায় নিয়ে এক অত্যাচারী প্রভুদের সাথে শ্রমিকদের ফাইট হয়, তারই প্রতীকি স্বরূপ এ যুগে ইতালিতে গ্রামকে গ্রাম লোক কমলা লেবু ছুঁড়ে সেলিব্রেট করে।হৃত্বিক,ফারহান ও ক্যাটরিনা এই উৎসবকে ভারতে প্রভূত জনপ্রিয় করেন। অনেকে আশা করেন এখানে গেলেই বুঝি সিনেরিটা স্কার্ট বাগিয়ে তেড়ে আপনার সাথে নাচতে আসবে, তবে সে গুড়ে বালি।

তবে কার্নিভ্যালের লাভের গুড় যদি কোথাও থেকে থাকে, তবে তা নিঃসন্দেহে ইতালি।  কমলা উৎসব ছাড়াও সেখানে পাবেন দ্য কার্নিভ্যাল অফ ভেনিস। ভেনিস ,কার্নিভ্যালের মুখ হলেও, কার্নিভ্যাল মুখোশের। হঠাত করে দেখলে টিনটিন এর "বিপ্লবীদের দঙ্গলে"র কথা মনে হতে পারে। উতসবের "শ্রী-গনেশ" হয়েছিল ১১৬২ তে পেট্রিয়ার্কেট অফ অ্যাকিলিয়া বিজয়কে স্মরনীয় করে রাখতে। ১৩শ শতকে পোর্সেলিন মুখোশ চালু হয়েছিল মূলত সমাজের উচ্চ নিচ ভেদাভেদ দূরীকরনের জন্য।

 অন্ধকার আকাশ চিরে অকাল দীপাবলী আসে ডিসেম্বর মাসে,দুবাই এ। এটা সম্ববত বিশ্বের সর্ববৃহত শপিং ফেস্টিভ্যাল। বিশ্বের সমস্ত শপিংপ্রিয় গিন্নিদের ফেভারিট ,১৯৯৬ সালে শুরু হওয়া এই ফেস্টিভালের লক্ষ্ম ছিল দুবাই কে পর্যটক দের গন্তব্য করে তোলা। আস্তে আস্তে পুষ্পে পল্লবে বিকশিত হয়ে,সেলেব পার্ফম্যান্স হরেক বিকিকিনি কে সম্বল করে, মিডল ইস্টের নয়নের মনি এই ফেস্টিভ্যাল চলে ডিসেম্বরের শেষ থেকে জানুয়ারীর মাঝামাঝি পর্যন্ত। শুরু আর শেষের দিনে,আকাশ আলো করা আতশবাজীর রোশনাই এ আপনাকে আই পি এল মনে করাবেই ডি এস এফ বা দুবাই শপিং ফেস্টিভ্যাল।

কোলোন কার্নিভ্যালের তাড়া ডি এস এফের চেয়ে বেশি। নভেম্বরেই এর সূচনা,জার্মানি তে। যদিও মূল ফেস্টিভ্যাল গড়ায় ফেব্রুয়ারী অব্দি। একে বলা হয় ফিফথ সিজন অফ দ্য ইয়ার। উতসবের এক দিন মহিলাদের জন্য বরাদ্দ। রোজ মনডে র দিন, রংচঙে অদ্ভুত সাজপোশাকে রাস্তায় চলে বর্নাঢ্য শোভাযাত্রা।

তবে কার্নিভ্যালের রানী যদি কেউ হয়, তাহলে সে রিও। ২০০ ও বেশি সাম্বা স্কুলের ছাত্রছাত্রীরা থাকেন এই কার্নিভ্যালে,রোজ দু মিলিয়ন মানুষের জমায়েত হয় এই উতসবে। ফেব্রুয়ারির প্রথম দু সপ্তাহে মূলত চলে এই উৎসব। সাম্বা নাচ,উতসাহী মানুষের ভিড়, রংচঙে পোষাক, এই ফেস্টিভ্যালকে করে তুলেছে বিশ্বের এক অন্যতম আকর্ষক উৎসব । বেনীআসহকলার চলমান প্রদর্শন ব্রাজিলের অন্য ফেস্টিভ্যাল গুলোকে বলে বলে ১০ গোল দেয় রিও কার্নিভ্যাল।

নটিঙ্ঘ্যাম থেকে কোপেনহেগেন, ত্রিনিদাদ এন্ড ট্যোবাগো থেকে ফ্র্যান্সের নিস, সর্বত্র জীবনের থিম একটাই,প্রান যায়,পর ফেস্টিভিটি না যায়ে। ইউরোপের টপ ৫০টি ফেস্টিভ্যালের লিস্টে থাকা কার্নিভ্যাল অফ বাসেল,সুইজারল্যান্ডের সর্ববৃহত ফেস্টিভ্যাল, ফেস্টিভ্যাল অফ বাসেলের রঙিন চুল হাসিমুখ মুখোশে ঢাকা মার্চপাস্টের মডেল যেন বলে যায় জীবনের থিম,অন্তরে সব অতৃপ্তি যেন ঢেকে যায় উতসবের হাসিমুখে।

সোমবার, ২২ অক্টোবর, ২০১৮

বিয়ের গিফট

বাঙালী বিয়েতে এখনো বিরল প্রজাতির প্রানী পাওয়া যায়। খামে ভরা একুশ টাকা।

মন ভারী করা কনে বিদায়ের পর, কোন ভারী করা খাম একে একে খোলা। ধপধবে সাদা ধুতির মত খামের কোনে মেক আপ করা নববধূর চেয়েও চকচকে একটি কয়েন তার দুই অনমোল রতন,দুই দশ টাকার নোট কে নিয়ে সাক্ষাৎ রাখী গুলজার, "মেরে করন অর্জুন আয়েঙ্গে"। নেহাৎ সময়ের আগে লেখা,নচেৎ কবি নির্ঘাত লাইন এডিট করে লিখতেন, একুশ টাকার খাম কি দুঃসহ। খাম খুলে দেখা কনেপক্ষ বেশ কিছুক্ষন ধন্দ্বে থাকে, কোনটার জন্য বেশি দুঃখ করবে,মেয়ে শ্বশুরবাড়ি চলল নাকি বিয়ের গিফট এ, একুশ টাকা। বিয়ের পাওনা একুশ টাকা বরাবরই হঠাৎ চলে আসা বাপের সামনে সিগারেট ট্যাপ করা ছেলের মত,ধোঁয়া গিলতেও পারে না,ফেলতেও পারে না।

এমনিতে বাঙালী দুটি বিষয় নিয়ে চিরকাল কনফিউশানে থাকে। দেশপ্রেমের সিজনে নেতাজী বেঁচে আছেন কি নেই,আর বিয়ের সিজনে ক্যাশ নাকি গিফট। পাত্রপক্ষ আমেরিকা প্রবাসী,বড় বিজনেসম্যান,বিরাট চাকরি,দুবাই ফেরৎ হলেই তেড়ে কনফিউশান,'একে কি দেওয়া যায়?' মানে আমেরিকায় সুইপার হলেও বাই ডি ফল্ট ধরে নেওয়া হয় তার আঢেল বিত্ত, বাড়িতে রিমোট দেওয়া স্যান্ডেল, নাইকুন্ডুলিতে তেল চটকানো অটোমেটিক মধ্যমা সব তার আছে,অতএব কোনো গিফটই তার অধরা নয়। মনেকা সরকারের মত হাত ঘোরালেই সে তুরুশ্চু পাপোশ,কম্বল পর্দার ইম্পোর্টেড ভার্সান এমন করে হাজির করবে যেভাবে দিদির ব্রিগেডে লোক। অতএব,ক্যাশ। শিরদাঁড়া শক্ত করে " আমার যেটা সাধ্যি সেটাই দেবো তো",বলে সাদা খাম ও চকচকে কয়েনপন্থী।

ক্লোজ আত্মীয় হলে হিসেব সহজ,বারোয়ারীভাবে সোনার কানের দুল। বিয়েতে নতুন বৌ যত কানের দুল পায়,অত দেবদেবী হিন্দু শাস্ত্রেও নেই। বিয়ের সিজনে রুপোর কানখুস্কি খুঁজতেও যদি জুয়েলারি শপে ঢোকেন, সেলসবয় সাক্ষাৎ শ্রীভৃগু আদী, কানের দুল দেখাবেই। শস্তা থেকে দামী,এমনকি বাজেটে না পোষালে দুটো নাকছাবি কিনে,দামি বাক্সে পুরে তাকে কানের দুলরূপে নবজন্ম দেওয়া হয়। আপনিও তৎক্ষনাৎ, হ্যাঁ তো,অমুকের তো বিয়ে,বলে কানের দুল কিনে বাড়িমুখী।
এবং বিয়ে বাড়িতে,এই কানের টা কার,ঐ কানের টা,মানে 'কানের' মাথা খাওয়ার উপক্রম করে।

কেউ অবিশ্যি চূড়ান্ত সেক্সিস্ট। মানে সেক্স এ অ্যাসিস্ট করার সামগ্রী দেয় বিয়েতে এবং সেটা বেডকভার। এমন দিলুম যাতে দুজনেই ব্যবহার করতে পারবে, মানে আমি সাম্যবাদের শেষ কথা,এইটে ভেবে হেব্বি পুলক পায় কেউ কেউ,কেউ কেউ আবার "ব্যবহার করবেই!!" এইটে ভেবে হাওয়াতে চ্যালেঞ্জ দেয়। সেই চ্যালেঞ্জ কাটা ঘুড়ির মত ঠোক্কর খেতে খেতে অন্যের বিয়েতে চালান হয়ে যায় ঐ এক ভাবনা নিয়েই।

একটা সময় বিয়েতে বই দেওয়া হত। সেই নিয়ম মেনে এখন হোয়াটস্যাপ দেওয়া উচিত,বা স্মার্টফোন। যে যুগে যেটা পাঠ্য। কেউ কেউ অবিশ্যি গিফট ভাউচারও দেয়। আমাদের এক কাকার বিয়েতে গিফট চেকে ৫১টাকা দেওয়া হয়েছিল। গিফট চেক তখন হেব্বি কুলীন,চারপাশের গিফট র‍্যাপগুলো সিঁটিয়ে বসে আছে,কাকা বন্ধুবান্ধবকে কলার তুলে বলছে, গিফট চেক বুঝলি,ওনার ছেলে কলকাতায় থাকে কিনা,কেতই আলাদা। যদিও রিক্সাভাড়া করে ব্যাঙ্কে গিয়ে চেক ভাঙাতে ৩০টাকা খরচ হয়ে গেছিল,সে অবশ্য অন্য কথা।

এখন গ্লাস ডিনার সেট অনলাইন অর্ডারের ভিড়ে,ট্রলিব্যাগ বা টাওয়েল সেট পেরিয়ে,নববধুর হাতের ঝকমকে ব্যাগে সাদা ধুতির মত পাটভাঙা নাম না লেখা খামে কারো অগোচরে থকে যায় দুটো দশ টাকার নোট আর একটা চকচকে কয়েন। যেটা দেখে বাড়ির কোনো এক বড় হয়ত মুচকি হেসে তুরন্ত গম্ভীর হয়ে বলেন...রেখে দাও,এক টাকা শুভ হয়...

শুক্রবার, ১৯ অক্টোবর, ২০১৮

শুভ বিজয়া

আপনিও মা দুর্গার চটি খুঁজতেন?

বড়পিসি বাড়ি চলে যবে,তার আগে বাড়ি জুড়ে হই হই রব।পিসির চটি হাওয়া।এ কিন্তু দিদি তেরা দেবর দিওয়ানা হবার জন্মযুগ আগের কেস। কালো আবলুশ কাঠের তিন তাকের জুতোর র‍্যাক থেকে জুতো ভ্যানিশ মানেই সব্বাই বাড়ির সবচেয়ে ছোটো ম্যাজিশিয়ানের দিকে তাকাতেন। বকুনি, অনুনয়,"এনে দে ট্রেন মিস হয়ে যাবে","পরের বার আবার আসবে তো" এসবে চিঁড়ে ভিজত না। অতঃপর বড়ঘরের কালো বর্ডার দেওয়া লাল মেঝেতে ধপাস করে বসে বড়পিসি বলতেন, আচ্ছা, আর একদিন থেকেই যাই,তখন ঢাউস গোদরেজ আলমারির নিচ থেকে বেরোত চটিজোড়া।পিসি ও চটি ভ্যানিশ করা পিসি সরকার, দুয়েরই মুখে হাসি।

দশমীর সকালটা ছিল ফ্লপ ফিল্মের হল এর মত। সব নতুন জামা শেষ,সপ্তমীর টাই রিপিট হত। পাড়ার বারোয়ারি পুজোমন্ডপে কেমন আলুথালু ভাব,হরেক মাল ৫টাকার দোকানে গোছগাছ চলছে,বেলুন ফাটানোর রিঙে গত রাতের না ফাটা বেলুন অবিবাহিতা গতযৌবনার মত তাকিয়ে,মাঠে ছড়িয়ে থাকা শালপাতা আর কাগজের টুকরোরা এ ওকে জড়িয়ে আছে পার্কের দাদা দিদির মতে, মাঠে এলাউন্স (ওটাই বলত সবাই) টাও অভিমানে মুখ ফুলিয়ে,কথাই বলছে না। কনফিডেন্ট ফুচকাওয়ালাও দুটাকায় ১০টা ফুচকা দিত, ৮টার বদলে। আর মা দুর্গার সামনেটা,স্টেজ শো শেষের মাচা সিঙ্গারের মত, শো শেষ...তাই হামলে পড়া পাবলিক নেই।

ফ্ল্যাট বাড়ি থেকে অতিথি চলে গেলে যেমন "আহ,শান্তি" বলে আপনি দরজা লাগান, লিফট অব্দিও যান না, তখন সেরম ছিল না। সকাল থেকে প্রস্তুতি চলত, মিষ্টিমুখ,সিঁদুরখেলা, আখাড়ার লাঠিখেলা আর ড্যাংকাড়্যাকার মা কে এগিয়ে দিত স্টেশান অব্দি,ভাসানে জলে ছপাস করে মা আস্তে আস্তে কু ঝিক ঝিক হলেও সবাই অনেক্ষন তাকিয়ে থাকত স্টেশানে আস্তে আস্তে হাত নাড়া বোকাদের মত, আসলে জীবনে তখন স্পীড পেট্রোল ছিল না। ছিল না,দশমীর সকাল থেকেই "শুভ বিজয়া" হোয়াটস্যাপে ফরোয়ার্ড করে "আমিই ফার্স্ট" জানানোর ডংকা।

তখন সকালে প্রনাম বা বিজয়ার শুভেচ্ছা জানানো ছিলো রাখি সাওয়ান্তের আই আইটি পাওয়ার মত,অসম্ভব। সন্ধ্যের আগে প্রনাম জানালেও বাড়ির বৃদ্ধরা জানতে চাইতেন," ঠাকুর ভাসান হয়েছে তো?"মনের মধ্যে এই চারটে দিনকে আগলে রাখতেন শেষ সেকেন্ড টা অব্দি, যেভাবে নিঃশ্বাস থাকে ফুসফুসে,কিংবা সন্তান থাকেন দু আঁজলায়।

আর আমি দেখতাম,মা দুর্গার পায়ের কাছটায়, যেখানে সিংহ টা কামড়ে ধরেছে মহিষাসুর কে,যেখানে অসুরের বুকের কাছটায় আলতা মাখা পা টা রয়েছে,তার নিচেটায়। যদি কোথাও মা দুর্গা খুলে রাখেন তার চটিজোড়া...

।। নীলাঞ্জন ।।

সোমবার, ১৫ অক্টোবর, ২০১৮

নেলপালিশ

তুমি ব্রেক আপ বাফারিং,আমায় লেখা পাঠাও স্মুচে
চোখে ভাইরাস, ভয় পাও,যদি লিপস্টিক যায় মুছে
আমি পুওর কানেকশান,তুমি নখের ছোঁয়া দিলে
আমি নেলপালিশটা হবো,তোমার বিষাদ অন্ত্যমিলে

সোমবার, ৮ অক্টোবর, ২০১৮

মহালয়া

বললে বিশ্বাস করবেন না,আমি ছেলেবেলায় বিরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের চন্ডীপাঠ আদৌ শুনতাম না, ভালোই লাগত না...

এমন সময়ের কথা বলছি, যখন হোয়াটস্যাপে "শুভ মহালয়া" দেগে দেওয়ার হিড়িক পড়েনি,মাটির দুর্গা চোখে স্মৃতিতে এইসান ছেপে রাখা হত, যে ব্রেন ফর্মাট করলেও মিটবে না,তখনো "দুর্গার ছবি ওয়ালপেপার না করলে জাত যাবে" এই নীতি আসেনি, ওয়ালপেপার আর কোয়ান্টাম ফিজিক্স একই রকম দুর্বোধ্য ছিলো যে।
সেই সময় মহালয়ার আগের দিন পুরোনো ঢাউস রেডিওটা তাক থেকে নামিয়ে, নতুন ব্যাটারি পরিয়ে টেবিলের উপর রাখা হত,দাদুর ঘরে।শোওয়ার সময় ঠাকুমা বলত "তাড়াতাড়ি ঘুমিয়ে পড়ো,কাল তো আবার চারটের সময় উঠতে হবে"।সারারাত ঘুম আসত কৈ, পটকার আওয়াজ আস্তে আস্তে দূর থেকে কাছে চলে আসত বর্গির মত।এলার্ম দেবার দরকার পড়ত না,মাঝে মাঝে ঘুম ভেঙে যেত আর ঘড়িতে দেখতাম, দেড়টা,দুটো,আড়াইটে...
ভোর চারটেয় ঘুম থেকে উঠেই পুরোনো ওয়েস্টার্ন টিভির ব্রাউন শাটার টা খুলে দিতাম, টিভিতে তখন ঝিলমিল, দাদু বলত, ওটা নয়, ওটা ৬টা থেকে, রেডিওটা চালাও।তখনই বাড়িতে ঢুকে পড়তেন সেই মানুষটি, যাকে আমার শুরুতে মনে হত, "দূর, কি বলছে, কিস্যু বুঝছি না,টিভিতে কখন শুরু হবে?", লম্বা লাল মেঝের বারান্দায় ক্যাপ ফাটাতে ফাটাতে বাবা, কাকা, যারা বিছানায় শুয়ে শুয়ে গোটা বাড়িতে ছেয়ে যাওয়া শব্দটায় কান পেতে বসে আছে,তাদের বিরক্ত করতাম...ইন্টারেস্ট পেতাম, যখন ওই অস্ত্রে দেবার সময় টা আসত,আর পাঠের শেষের দিকে মনে হত, ভদ্রলোক কি কেঁদে ফেললেন!!টিভিতে কখন দেবে বলোতো...!!!এবারে কি অসুর গুলো মেঘ থেকে আসবে না সমুদ্র থেকে??
অভ্যেস আর ম্যাচিওরিটি,বাংলা ফিল্মের পুলিশ এর মত, লেট করে আসে।আমার বোধটা লেটে এসেছিল,হয়তো ঐ সেভেন এইটে পড়তে।তারও অনেক অনেক বছর পর, রেডিওতে কাজ পেলাম, ঘটনাচক্রে শো এর শুরুর দিন...মহালয়া...মহিষাসুরমর্দিনীর পর আমার শো, সাতটা থেকে।টেনশানে ভোর চারটে নাগাদ পৌছে গেছিলাম স্টূডিওতে...ভোর থেকে ফাঁকা অফিসে আমি ও সেই কন্ঠস্বর...আপ্লুত করছিল, আবিষ্ট করছিল, গ্রাস করছিল চেতনাকে, যেভাবে অক্টোপাস পাকড়ে ধরে, যেভাবে অ্যানাকোন্ডা গিলে খায়...
টেনশানে ভদ্রলোককে আদৌ ভালো লাগছিলো না, বার বার মনে হচ্ছিল, দূর, এত ভালো শো কেউ করে...এর পরে কে আমাকে শুনবে!!!!
সকালে টিভি দেখার অভ্যেস আর নেই, সেই থেকে, মহালয়া তে একাই আসি, ভোর থেকে অফিসে...সর্বকালের সর্বসেরা জক কে একান্তে শুনতে...রেডিওর,শুধু রেডিও কেন,সব রকম মিডিয়ামের সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ট শো কে,কুর্নিশ জানাতে...
আপনি যে কোনো পেশায় কাজ করতে পারেন...কিন্তু আমার অহংটা কে টপকাতে পারবেন না...আমি রেডিতে কাজ করি...যেখানে বিরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের মহিষাসুরমর্দিনী হয়...

।।  নীলাঞ্জন।।