মঙ্গলবার, ২৬ নভেম্বর, ২০১৯

লাথি

আমাদের ছোটোবেলায় এক মস্ত সুখ ছিলো। সব কিছুর একটা সহজ ও তুরন্ত সমাধান হিসেবে লাথি পাওয়া যেতো। মানে ধরো জ্বর হয়েছে, দাদু বললেন বিছানায় লাথি মেরে বল জ্বর পালিয়ে যা,তাই করলাম জ্বর বাবাজি জাঁকিয়ে এলেও জানলাম,পালিয়ে যাবে,যাবেই। শুধু জ্বরে নয়,পৃথিবীর সব সমস্যার সমাধান আমাদের বাড়িতে ছিলো, হাতি দেখে মেজোকাকার মেয়ে কেঁদে গড়িয়ে পড়ছে, ঠাকুমা ছড়া কাটলেন, হাতি তোকে জোড়া পায়ে লাথি, ব্যাস,খল খল করে হাসতে শুরু করলো বোন। মোটমাট জানতাম,জীবনের ওঠাপড়া সহজে গায়ে লাগলেই তার জন্য একটি ভিন্নধর্মী লাথি বরাদ্দ রয়েছে। মানে ঠাকুরদার সাথে ঝগড়া করে দাঁত কিড়মিড় করে, "ঝাটা মার ঝাটা মার,দে লাথি" তার সাথে বড়দের গায়ে পা লাগলে পা কেটে যাবে, তার একটা গুনগত পার্থক্য ছিলো। নইলে ঐটা রেগেমেগে বলা যায়,অথচ এইটা দেওয়া যায় না কেন,সেটা অনেক ভেবেও পাইনি। এখন বুঝি,মুখে বলা চুপিচুপি ঐ লাথিটা স্ট্রেসবাস্টার্স লাথি।  মুড়ো ঝাঁটা হাত দেওয়া যায় না অথচ পায়ে করে ঠেলে সরিয়ে দেওয়াই যায়, ফুটবলের প্রান বা দেবতার অধীষ্ঠান নেই,তাতে পা দেওয়া যায়, কিন্তু ফুলের সাজিতে সাক্ষাৎ নারায়ন থাকেন,তাতে পা ঠেকলেই শূলে চাপানো হবে। এরকম নানাবিধ নিয়মে বুঝতাম, সব সমস্যার সমাধান আছে। সাজিতে চুপি চুপি পা লেগে গেলে গঙ্গাজল ঠেকালেই শুদ্ধু, কিন্তু ফুলে পা ঠেকালে ফেলে দিতে হবে। লাথিকূলের কৌলিন্য ও শূদ্র ভেদ ছিলো, সে বিলক্ষণ বুঝেছি। ক্যারাটে তে লাথি মারা যায়, কিন্তু বন্ধুদের সাথে ঝগড়া করে পা দেখালেই আড়ংধোলাই এর ব্যবস্থা ছিল তখন বাড়িতে বাড়িতে।  মানে অসম্মান অর্থে লাথি বলা বা ব্যবহার ছিলো পরিত্যাজ্য। কেউ কথায় ওটা বলা মানেই নিম্ন শ্রেনীর, ভালো লোক নয়,এটা ধরে নেওয়া হত। মানে মার খাবি, আর লাত খাবি এটার মধ্যে ভালো আর ইতর ভেদাভেদ হয়ে যেত সহজেই।
তখন অবশ্য প্রকাশ্যে এভাবে খিস্তির উদজাপন হতো না, পলিটিশিয়ানের জামা টানা ছেঁড়া হয়তো হত, কিন্তু গায়ে পা তোলার অসভ্যতা কেউই করতো না, কারন সবার বাড়িতেই একটা মূল্যবোধ কাজ করতো। সাধারণ মানুষ এগিয়ে গিয়ে ঝগড়া করছে এই দৃশ্যটাই খুব অদ্ভুত লাগতো,আমরা ভেবে নিতাম ও তো ভালো,তা ও ঝগড়া করছে কেনো?? গায়ে লাথি মেরেছে এ ছিলো কল্পনাতীত।
এখন অবশ্য সবই সম্ভব, জনতা রবীঠাকুরের গানে অবলীলায় খিস্তি জুড়ে অশিক্ষার উৎসবে মাতে,কখনো কেউ কাউকে খুব সহজেই লাথি কষায়...     

মঙ্গলবার, ১৯ নভেম্বর, ২০১৯

মেনস ডে

আমাদের জয়েন্ট ফ্যামিলিতে ঠাকুমা বিখ্যাত ছিলেন পুজো করার জন্য। সকাল থেকে শুরু করে পুজো চলত বেলা ১১টা অব্দি। ফলত মা কাকিমা রা সকালের জলখাবারের জন্য অপেক্ষা করতো সেই অব্দি। কারন শ্বাশুড়ি না খেলে তো আর আগে খেয়ে নেওয়া যায় না। রাশভারী দাদু এগিয়ে এসে বলতেন,খেয়ে নাও বৌমা, তোমার শ্বাশুড়ি না এলে কি তোমরা না খেয়ে থাকবে নাকি। ঠাকুমার ভয়ে মা রা অপেক্ষাই করে এসেছে, দাদু কিন্তু বার বার বলতো,আগে খেয়ে নেবার কথা...
সে আমলে পুরুষদের প্রাইড ছিলো ভালো মাছ কিনে নিয়ে আসা, রবিবার দুপুরে মাছ মুখে দিলেই সব্বাই প্রশংসায় পঞ্চমুখ হয়ে উঠবে,সে পুরস্কার অস্কারের চেয়ে কম ছিলো না সে আমলের পুরানো সংসারে। বাবা চিরকাল ঠকে আসতো,হয় পচা মাছ গছিয়ে দিতো, নয় খুচরো গুনে আনতে গিয়ে। মাকে আবার হেঁটে হেঁটে বাজার যেতে হতো, চিরকাল রবিবার দুপুরের মাছের প্রশংসা মায়ের ভাগে গ্যাছে, বাবা সারা জীবন অবলীলায় হাসিমুখে সেটা শুনে গ্যাছে পুরুষতান্ত্রিক আস্ফালন ফেলে রেখে। 
এভাবেই আমাদের ছেলেবেলাতে কাকিমা রাগ করে না খেয়ে দোতলায় বসে থাকলে হাতে ভাতের থালা নিয়ে কাকাকে রাগ ভাঙাতে যেতে দেখেছি,"খিদে পেলে নিচে এসে খেয়ে যাবে" এরকম শুনিনি কখনো।তেলের বাটি নিয়ে হেব্বি ঝামেলা চলছে, দিদিকে চুল টেনে মারতেই কানে টান পড়লো...বড়দা সারাদিন কান ধরে দেওয়ালে দাঁড়িয়ে থাকার শাস্তি দিলেন। লক্ষ্মীপুজোর শেষে, সত্যনারায়ণ পুজোর সিন্নি মাখার দায়িত্ব উপোসী মেজোকাকার, না খেয়ে থাকা মা কাকিমার জন্য শরবত করে আনছে আরেক অঞ্জলি দেওয়া পুরুষ ছোটোকাকা...
সন্ধ্যের পর বাড়ি থেকে বেশি বেরোনোর হুকুম ছিলো না, স্ট্রীট লাইট জ্বলার আগে বাড়ি ঢোকার ফরমান ছিলো,তবে তা সবার জন্যেই, সিনেমা হলে যাবার উপর ফতোয়া ছিলো বাড়িতে, দাদুকে লুকিয়ে খিড়কির দরজা দিয়ে পিসি,কাকিমা মা কে বের করে আনা হতো, ফিরতে লেট হলে গল্প রেডি রাখতো সেজোকাকা, কাকিমার মাথা ধরেছে মা সেবা করছে, দরজা বন্ধ, দাদু কতবার ফাঁকা ঘরের বন্ধ দরজার বাইরে থেকে মাথা ধরা সারার টোটকা বলেছে তার ইয়ত্তা নেই। রাত জেগে ভিডিও দেখা হবে, তিন কাকু, কাকিমা,মা, পিসতুতো দুই দিদি, কাকারাই রাশভারি দাদুকে লুকিয়ে ভিসিপি মেশিন ক্যাসেট আনলেন দোতলায়। সারারাত সিনেমা দ্যাখা চললো, পরের দিন সকালের চা বানানো বাবার দায়িত্ব। 
ছেলেবেলা জুড়ে এমন অজস্র পুরুষ চরিত্র ঘুরে ফিরে এসেছে আমার সেই মফস্বলে ...সহমর্মি, বন্ধু, সমস্যার সমাধান করা চরিত্র...প্রতিবাদী...বাসে গুঁতিয়ে দেওয়া চরিত্রগুলোকে মেলাতে  আজ বড়ো কষ্ট হয়...কখনো নিজে ভুল করলেও যেনো দাদার কান ধরে দেওয়ালে মুখ করে দাঁড়ানোর মুহুর্তটা ফিরে আসে...মুচড়ে যাওয়া হৃদয়ে নিজেই ছোটো হই কখনো...মনে পড়ে ছেলেবেলার পুরুষতান্ত্রিক সমাজেও প্রতিদিনের সেলিব্রেট করা অন্য পুরুষদের, আমাদের চারপাশে সাধারন হয়ে ঘোরা অসাধারণ পুরুষদের সব্বাইকে...

হ্যাপি মেনস ডে...