আমাদের ছোটোবেলায় এক মস্ত সুখ ছিলো। সব কিছুর একটা সহজ ও তুরন্ত সমাধান হিসেবে লাথি পাওয়া যেতো। মানে ধরো জ্বর হয়েছে, দাদু বললেন বিছানায় লাথি মেরে বল জ্বর পালিয়ে যা,তাই করলাম জ্বর বাবাজি জাঁকিয়ে এলেও জানলাম,পালিয়ে যাবে,যাবেই। শুধু জ্বরে নয়,পৃথিবীর সব সমস্যার সমাধান আমাদের বাড়িতে ছিলো, হাতি দেখে মেজোকাকার মেয়ে কেঁদে গড়িয়ে পড়ছে, ঠাকুমা ছড়া কাটলেন, হাতি তোকে জোড়া পায়ে লাথি, ব্যাস,খল খল করে হাসতে শুরু করলো বোন। মোটমাট জানতাম,জীবনের ওঠাপড়া সহজে গায়ে লাগলেই তার জন্য একটি ভিন্নধর্মী লাথি বরাদ্দ রয়েছে। মানে ঠাকুরদার সাথে ঝগড়া করে দাঁত কিড়মিড় করে, "ঝাটা মার ঝাটা মার,দে লাথি" তার সাথে বড়দের গায়ে পা লাগলে পা কেটে যাবে, তার একটা গুনগত পার্থক্য ছিলো। নইলে ঐটা রেগেমেগে বলা যায়,অথচ এইটা দেওয়া যায় না কেন,সেটা অনেক ভেবেও পাইনি। এখন বুঝি,মুখে বলা চুপিচুপি ঐ লাথিটা স্ট্রেসবাস্টার্স লাথি। মুড়ো ঝাঁটা হাত দেওয়া যায় না অথচ পায়ে করে ঠেলে সরিয়ে দেওয়াই যায়, ফুটবলের প্রান বা দেবতার অধীষ্ঠান নেই,তাতে পা দেওয়া যায়, কিন্তু ফুলের সাজিতে সাক্ষাৎ নারায়ন থাকেন,তাতে পা ঠেকলেই শূলে চাপানো হবে। এরকম নানাবিধ নিয়মে বুঝতাম, সব সমস্যার সমাধান আছে। সাজিতে চুপি চুপি পা লেগে গেলে গঙ্গাজল ঠেকালেই শুদ্ধু, কিন্তু ফুলে পা ঠেকালে ফেলে দিতে হবে। লাথিকূলের কৌলিন্য ও শূদ্র ভেদ ছিলো, সে বিলক্ষণ বুঝেছি। ক্যারাটে তে লাথি মারা যায়, কিন্তু বন্ধুদের সাথে ঝগড়া করে পা দেখালেই আড়ংধোলাই এর ব্যবস্থা ছিল তখন বাড়িতে বাড়িতে। মানে অসম্মান অর্থে লাথি বলা বা ব্যবহার ছিলো পরিত্যাজ্য। কেউ কথায় ওটা বলা মানেই নিম্ন শ্রেনীর, ভালো লোক নয়,এটা ধরে নেওয়া হত। মানে মার খাবি, আর লাত খাবি এটার মধ্যে ভালো আর ইতর ভেদাভেদ হয়ে যেত সহজেই।
তখন অবশ্য প্রকাশ্যে এভাবে খিস্তির উদজাপন হতো না, পলিটিশিয়ানের জামা টানা ছেঁড়া হয়তো হত, কিন্তু গায়ে পা তোলার অসভ্যতা কেউই করতো না, কারন সবার বাড়িতেই একটা মূল্যবোধ কাজ করতো। সাধারণ মানুষ এগিয়ে গিয়ে ঝগড়া করছে এই দৃশ্যটাই খুব অদ্ভুত লাগতো,আমরা ভেবে নিতাম ও তো ভালো,তা ও ঝগড়া করছে কেনো?? গায়ে লাথি মেরেছে এ ছিলো কল্পনাতীত।
এখন অবশ্য সবই সম্ভব, জনতা রবীঠাকুরের গানে অবলীলায় খিস্তি জুড়ে অশিক্ষার উৎসবে মাতে,কখনো কেউ কাউকে খুব সহজেই লাথি কষায়...
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন