মঙ্গলবার, ১৯ নভেম্বর, ২০১৯

মেনস ডে

আমাদের জয়েন্ট ফ্যামিলিতে ঠাকুমা বিখ্যাত ছিলেন পুজো করার জন্য। সকাল থেকে শুরু করে পুজো চলত বেলা ১১টা অব্দি। ফলত মা কাকিমা রা সকালের জলখাবারের জন্য অপেক্ষা করতো সেই অব্দি। কারন শ্বাশুড়ি না খেলে তো আর আগে খেয়ে নেওয়া যায় না। রাশভারী দাদু এগিয়ে এসে বলতেন,খেয়ে নাও বৌমা, তোমার শ্বাশুড়ি না এলে কি তোমরা না খেয়ে থাকবে নাকি। ঠাকুমার ভয়ে মা রা অপেক্ষাই করে এসেছে, দাদু কিন্তু বার বার বলতো,আগে খেয়ে নেবার কথা...
সে আমলে পুরুষদের প্রাইড ছিলো ভালো মাছ কিনে নিয়ে আসা, রবিবার দুপুরে মাছ মুখে দিলেই সব্বাই প্রশংসায় পঞ্চমুখ হয়ে উঠবে,সে পুরস্কার অস্কারের চেয়ে কম ছিলো না সে আমলের পুরানো সংসারে। বাবা চিরকাল ঠকে আসতো,হয় পচা মাছ গছিয়ে দিতো, নয় খুচরো গুনে আনতে গিয়ে। মাকে আবার হেঁটে হেঁটে বাজার যেতে হতো, চিরকাল রবিবার দুপুরের মাছের প্রশংসা মায়ের ভাগে গ্যাছে, বাবা সারা জীবন অবলীলায় হাসিমুখে সেটা শুনে গ্যাছে পুরুষতান্ত্রিক আস্ফালন ফেলে রেখে। 
এভাবেই আমাদের ছেলেবেলাতে কাকিমা রাগ করে না খেয়ে দোতলায় বসে থাকলে হাতে ভাতের থালা নিয়ে কাকাকে রাগ ভাঙাতে যেতে দেখেছি,"খিদে পেলে নিচে এসে খেয়ে যাবে" এরকম শুনিনি কখনো।তেলের বাটি নিয়ে হেব্বি ঝামেলা চলছে, দিদিকে চুল টেনে মারতেই কানে টান পড়লো...বড়দা সারাদিন কান ধরে দেওয়ালে দাঁড়িয়ে থাকার শাস্তি দিলেন। লক্ষ্মীপুজোর শেষে, সত্যনারায়ণ পুজোর সিন্নি মাখার দায়িত্ব উপোসী মেজোকাকার, না খেয়ে থাকা মা কাকিমার জন্য শরবত করে আনছে আরেক অঞ্জলি দেওয়া পুরুষ ছোটোকাকা...
সন্ধ্যের পর বাড়ি থেকে বেশি বেরোনোর হুকুম ছিলো না, স্ট্রীট লাইট জ্বলার আগে বাড়ি ঢোকার ফরমান ছিলো,তবে তা সবার জন্যেই, সিনেমা হলে যাবার উপর ফতোয়া ছিলো বাড়িতে, দাদুকে লুকিয়ে খিড়কির দরজা দিয়ে পিসি,কাকিমা মা কে বের করে আনা হতো, ফিরতে লেট হলে গল্প রেডি রাখতো সেজোকাকা, কাকিমার মাথা ধরেছে মা সেবা করছে, দরজা বন্ধ, দাদু কতবার ফাঁকা ঘরের বন্ধ দরজার বাইরে থেকে মাথা ধরা সারার টোটকা বলেছে তার ইয়ত্তা নেই। রাত জেগে ভিডিও দেখা হবে, তিন কাকু, কাকিমা,মা, পিসতুতো দুই দিদি, কাকারাই রাশভারি দাদুকে লুকিয়ে ভিসিপি মেশিন ক্যাসেট আনলেন দোতলায়। সারারাত সিনেমা দ্যাখা চললো, পরের দিন সকালের চা বানানো বাবার দায়িত্ব। 
ছেলেবেলা জুড়ে এমন অজস্র পুরুষ চরিত্র ঘুরে ফিরে এসেছে আমার সেই মফস্বলে ...সহমর্মি, বন্ধু, সমস্যার সমাধান করা চরিত্র...প্রতিবাদী...বাসে গুঁতিয়ে দেওয়া চরিত্রগুলোকে মেলাতে  আজ বড়ো কষ্ট হয়...কখনো নিজে ভুল করলেও যেনো দাদার কান ধরে দেওয়ালে মুখ করে দাঁড়ানোর মুহুর্তটা ফিরে আসে...মুচড়ে যাওয়া হৃদয়ে নিজেই ছোটো হই কখনো...মনে পড়ে ছেলেবেলার পুরুষতান্ত্রিক সমাজেও প্রতিদিনের সেলিব্রেট করা অন্য পুরুষদের, আমাদের চারপাশে সাধারন হয়ে ঘোরা অসাধারণ পুরুষদের সব্বাইকে...

হ্যাপি মেনস ডে...

কোন মন্তব্য নেই: