শনিবার, ১৭ অক্টোবর, ২০২০

প্রদীপ ঘোষ স্মরনে

হলদে দেওয়াল ওয়ালা দোতলার ঘরে আমরা তিনজন। আমি,আমার বন্ধু তন্ময় আর একটা টেপরেকর্ডার...

তখনো ফরোয়ার্ড টিপলে একেবারে পরের কবিতায় জাম্প করা যায় না, তখনো ফেসবুক মাতৃগর্ভে, তখনো আমরা শেভ করতে শিখিনি,তখনো জানলার বাইরে চড়াইপাখি আসে,সেই সময় আমাদের আফসোস হতো,রাখালের জন্য...ইসস,মৈত্র মহাশয় ওনাকে না মারতেই পারতেন...

তখনো চশমা পরা ভদ্রলোকের মর্ম বুঝিনি,শুধু এটা জানতাম,বাঙালি বাড়িমাত্রেই কাজী সব্যসাচী আর এনার কবিতা ক্যাসেট থাকবেই। আমরা শুনতাম,লক্ষ্য করতাম "ইঞ্জিনের ধস ধস" বলার সময় স গুলোতে যেন ইঞ্জিনের তলা দিয়ে বেরোনো বাস্প বা ধোঁয়া যেন দেখা যায়, "কামাল তুনে কামাল কিয়া ভাই" এর প্রত্যেক কামাল যেন আলাদা করে কামাল করে দেয়, আমাদের দুচোখ মোড়া আফ্রিকা...কৈশোরের মহাদেশ তার সম্ভার থেকে যৌবনের স্বপ্নের মোড়ক খুলছে...

আমরা প্রদীপ ঘোষ কে চিনতাম না,আমরা কবিতা শুনতাম...আমরা দুপুরে বিছানায় চিত হয়ে কড়িকাঠের দিকে তাকিয়ে শব্দ দেখতাম। নেটফ্লিক্স ইউটিউবের আলোকবর্ষ সময় আগে,শব্দের প্রজেক্টার সেই সাদা ছাতের দেওয়ালে আর কালো কড়িকাঠে এঁকে দিতো কিনু গোয়ালার গলি বা কৃপণের সোনার কনা...অজস্র ক্যাসেট ছিলো না,ওই একটিকেই ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে রিওয়াইন্ড করে শোনা...এখনকার ছোকরাদের চোখে "বোরিং" বা "নট সো কুল" কাজ...

কিংবদন্তি র প্রয়াণ হয় না, কীর্তিরা অক্ষয় হয়ে থেকে যায়। রয়ে যায় সেই শব্দ-ছবি, সেই কড়িকাঠ, সেই কালো টেপ রেকর্ডারে শোঁ শোঁ রিওয়াইন্ডে, সেকেন্ড গুনে ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়া সেই দেবতার গ্রাসের শুরুটাতে...সেই আবৃত্তি কম্পিটিশানে, সেই অনর্গল মুখস্তের দিনে,সেই প্রানপণ এক্সপ্রেশান আনার চেষ্টায়...কেরিয়ারের ভাবনায় নয়,শেখার তাগিদে, ওনার সৃষ্টির মুগ্ধতায়...

আমার সেই কৈশোরের স্মৃতি যদ্দিন থাকবে...প্রদীপ ঘোষ থাকবেন...

কোন মন্তব্য নেই: