বাঙালী বিয়েতে এখনো বিরল প্রজাতির প্রানী পাওয়া যায়। খামে ভরা একুশ টাকা।
মন ভারী করা কনে বিদায়ের পর, কোন ভারী করা খাম একে একে খোলা। ধপধবে সাদা ধুতির মত খামের কোনে মেক আপ করা নববধূর চেয়েও চকচকে একটি কয়েন তার দুই অনমোল রতন,দুই দশ টাকার নোট কে নিয়ে সাক্ষাৎ রাখী গুলজার, "মেরে করন অর্জুন আয়েঙ্গে"। নেহাৎ সময়ের আগে লেখা,নচেৎ কবি নির্ঘাত লাইন এডিট করে লিখতেন, একুশ টাকার খাম কি দুঃসহ। খাম খুলে দেখা কনেপক্ষ বেশ কিছুক্ষন ধন্দ্বে থাকে, কোনটার জন্য বেশি দুঃখ করবে,মেয়ে শ্বশুরবাড়ি চলল নাকি বিয়ের গিফট এ, একুশ টাকা। বিয়ের পাওনা একুশ টাকা বরাবরই হঠাৎ চলে আসা বাপের সামনে সিগারেট ট্যাপ করা ছেলের মত,ধোঁয়া গিলতেও পারে না,ফেলতেও পারে না।
এমনিতে বাঙালী দুটি বিষয় নিয়ে চিরকাল কনফিউশানে থাকে। দেশপ্রেমের সিজনে নেতাজী বেঁচে আছেন কি নেই,আর বিয়ের সিজনে ক্যাশ নাকি গিফট। পাত্রপক্ষ আমেরিকা প্রবাসী,বড় বিজনেসম্যান,বিরাট চাকরি,দুবাই ফেরৎ হলেই তেড়ে কনফিউশান,'একে কি দেওয়া যায়?' মানে আমেরিকায় সুইপার হলেও বাই ডি ফল্ট ধরে নেওয়া হয় তার আঢেল বিত্ত, বাড়িতে রিমোট দেওয়া স্যান্ডেল, নাইকুন্ডুলিতে তেল চটকানো অটোমেটিক মধ্যমা সব তার আছে,অতএব কোনো গিফটই তার অধরা নয়। মনেকা সরকারের মত হাত ঘোরালেই সে তুরুশ্চু পাপোশ,কম্বল পর্দার ইম্পোর্টেড ভার্সান এমন করে হাজির করবে যেভাবে দিদির ব্রিগেডে লোক। অতএব,ক্যাশ। শিরদাঁড়া শক্ত করে " আমার যেটা সাধ্যি সেটাই দেবো তো",বলে সাদা খাম ও চকচকে কয়েনপন্থী।
ক্লোজ আত্মীয় হলে হিসেব সহজ,বারোয়ারীভাবে সোনার কানের দুল। বিয়েতে নতুন বৌ যত কানের দুল পায়,অত দেবদেবী হিন্দু শাস্ত্রেও নেই। বিয়ের সিজনে রুপোর কানখুস্কি খুঁজতেও যদি জুয়েলারি শপে ঢোকেন, সেলসবয় সাক্ষাৎ শ্রীভৃগু আদী, কানের দুল দেখাবেই। শস্তা থেকে দামী,এমনকি বাজেটে না পোষালে দুটো নাকছাবি কিনে,দামি বাক্সে পুরে তাকে কানের দুলরূপে নবজন্ম দেওয়া হয়। আপনিও তৎক্ষনাৎ, হ্যাঁ তো,অমুকের তো বিয়ে,বলে কানের দুল কিনে বাড়িমুখী।
এবং বিয়ে বাড়িতে,এই কানের টা কার,ঐ কানের টা,মানে 'কানের' মাথা খাওয়ার উপক্রম করে।
কেউ অবিশ্যি চূড়ান্ত সেক্সিস্ট। মানে সেক্স এ অ্যাসিস্ট করার সামগ্রী দেয় বিয়েতে এবং সেটা বেডকভার। এমন দিলুম যাতে দুজনেই ব্যবহার করতে পারবে, মানে আমি সাম্যবাদের শেষ কথা,এইটে ভেবে হেব্বি পুলক পায় কেউ কেউ,কেউ কেউ আবার "ব্যবহার করবেই!!" এইটে ভেবে হাওয়াতে চ্যালেঞ্জ দেয়। সেই চ্যালেঞ্জ কাটা ঘুড়ির মত ঠোক্কর খেতে খেতে অন্যের বিয়েতে চালান হয়ে যায় ঐ এক ভাবনা নিয়েই।
একটা সময় বিয়েতে বই দেওয়া হত। সেই নিয়ম মেনে এখন হোয়াটস্যাপ দেওয়া উচিত,বা স্মার্টফোন। যে যুগে যেটা পাঠ্য। কেউ কেউ অবিশ্যি গিফট ভাউচারও দেয়। আমাদের এক কাকার বিয়েতে গিফট চেকে ৫১টাকা দেওয়া হয়েছিল। গিফট চেক তখন হেব্বি কুলীন,চারপাশের গিফট র্যাপগুলো সিঁটিয়ে বসে আছে,কাকা বন্ধুবান্ধবকে কলার তুলে বলছে, গিফট চেক বুঝলি,ওনার ছেলে কলকাতায় থাকে কিনা,কেতই আলাদা। যদিও রিক্সাভাড়া করে ব্যাঙ্কে গিয়ে চেক ভাঙাতে ৩০টাকা খরচ হয়ে গেছিল,সে অবশ্য অন্য কথা।
এখন গ্লাস ডিনার সেট অনলাইন অর্ডারের ভিড়ে,ট্রলিব্যাগ বা টাওয়েল সেট পেরিয়ে,নববধুর হাতের ঝকমকে ব্যাগে সাদা ধুতির মত পাটভাঙা নাম না লেখা খামে কারো অগোচরে থকে যায় দুটো দশ টাকার নোট আর একটা চকচকে কয়েন। যেটা দেখে বাড়ির কোনো এক বড় হয়ত মুচকি হেসে তুরন্ত গম্ভীর হয়ে বলেন...রেখে দাও,এক টাকা শুভ হয়...
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন