আজকাল আমার অতীত আমাকে বড্ড কুরে কুরে খায়। একে ডিপ্রেশন বলে নাকি আত্মগ্লানি জানি না, সংজ্ঞায় সংজ্ঞায়িত করার বাসনা বা ইচ্ছে কোনোটাই নেই, তবে জীবনকে ফিরে দ্যাখা বলতে পারেন, ভুলের মুখোমুখি রোজ দাঁড়িয়ে নিজেকে চাবুক মারা বলতে পারেন, একটা সুস্থ আমি প্রতিদিন একটা অসুস্থ আমি কে দ্যাখে, আর তার খুঁতগুলো চোখে আঙুল দিয়ে দ্যাখায়...
একজন ড্রাগ অ্যাডিক্ট, চেইন স্মোকার, মদ্যপ যখন জীবনে ফিরে আসতে চায়, তখন তার উইথড্রয়াল এফেক্ট হয় শুনেছি,আমি সেটা ভোগ করছি, সাথে অপরীসিম ডিপ্রেশান। না আমি সারাজীবন মদ ড্রাগ সিগারেট ছুঁওয়েও দেখিনি, কিন্তু যে অভ্যেসে আমি রাতের পর রাত কাটিয়েছি, শব্দের জগতে, আকুতির জগতে, চাহিদার ইচ্ছেয়, সেটাও স্বাভাবিক নয় এবং সেটা অনুভব করেছি দিনের পর দিন। লড়ে চলেছি রোজ, নিজেকে আরেকটু, আরেকটু ভালো করার লক্ষ্যে, চরিত্রবান করার লক্ষ্যে। কিন্তু ফেরা সর্বদা সহজ হয় না। রত্নাকর যখন পরিবারের সবার কাছে প্রত্যাখ্যাত হয়ে ভেবেছিলো যে যাদের জন্য এত করলাম, তারাই আমার কাজের ভার বা দায় নিলো না, তখন তার মনে কি হয়েছিলো, সেটা ডিপ্রেশান নাকি কুরে কুরে খাওয়া অন্তরের জ্বালা সেটা বেশ বুঝতে পারি।
কিন্তু সে যুগে রত্নাকর থেকে বাল্মীকি হওয়াটা যতটা সহজ ছিলো, এখন কি তাই? মানুষ ক্রমাগতঃ পাথর ছুঁড়ে সে চেষ্টা টা নষ্ট করে দেয় না কি? ফেরার সুযোগ কি সবাই পায়? কে তার অন্তরটা খুলে দ্যাখাতে পারে, বুক চিরে বলতে পারে যে দ্যাখো এইটা আসল আমি, মাঝে কোনো একটা চরিত্রে অভিনয় করছিলাম, মাঝে কোনোভাবে আমার আমির ভিতর ঢুকে পড়েছিলো অন্য আমি, ঐ মানুষটা আমি নই...এই প্রমাণ কজন দ্যাখে, কজন বুঝতে চায়?
জীবনের শুরুর পর্ব থেকেই আমি একজন ফার্স্ট বেঞ্চার। পাড়ার টিপিকাল ভালো ছেলে। হাসতে থাকা, সব্বাইকে হাসাতে চাওয়া এক মানুষ যার লক্ষ্য ছিলো চারপাশে যেন দুঃখ না থাকে। বাড়িতে মানসিক অসুস্থ বাবা থাকলে, অর্থের অভাব থাকলে কি যন্ত্রণা নিয়ে চলতে হয়, ভুক্তভোগী ছাড়া আর কেউ জানে না, সেটাকে দূর করার জন্য আমার বন্ধুদের সাথে পাওয়া বিকেল ছিলো, আমার ভালোবাসাকে লুকিয়ে দ্যাখা ছিলো, ভয়ে কেউ প্রপোজ করতে এলে তাকে রাখী পরিয়ে দূর করিয়ে দেওয়া ছিল...হ্যাঁ আমি বিশ্বের একমাত্র ছেলে যে অন্যকে দূরে রাখার জন্য তাকে রাখী পরিয়ে বোন বানিয়ে স্বস্তিতে থাকতাম...কারন আমার জীবনে সমস্যা ছিল, কিন্তু তাকে দূরে রাখার ভালোবাসার হাত ছিলো, বন্ধুদের সাথ ছিল। একাকীত্ব ছিলো না। কথা বলার মানুষ ছিলো।
কিন্তু সন্তানকে ছেড়ে আসা র যন্ত্রণা কি, সেটা বলে বোঝানো যায় না। অফিস থেকে বাড়ি ফিরে নিজের শহর না পাওয়া, এঁদো যায়গার বিবমিষা,কারুর সাথে কথা বলতে না পারার একাকীত্ত্ব , মেয়ে কে কল করলে সে ফোন ধরতে চাইতো না অভিমানে, সেটার কুরে কুরে খাওয়ার অভিব্যক্তি মানুষকে পশু বানাক বা না বানাক, বাঁচতে চাওয়া মানুষকে ভাগাড়ে বা অন্য কোন স্টিমুলেটারে অভ্যস্থ করায়...পরের দিন সকালে উঠে বা দিনের কোনো এক সময়ে আসা সেই পর্বটা পেরোলে এক অদ্ভুত শূণ্যতা, নিজের কাছে নিজে হেরে যাওয়ার একটা পর্ব...
আপ্রাণ চেষ্টা করে যাওয়াটা আমার চরিত্রের একটা দিক, সেটাতেই ফিরে আসা, সেটাতেই লড়ে যাওয়া...আজ যখন ফিরে আসছি আমার সেই কিশোরবেলার আমির কাছে, সেই টিপিকাল ফার্স্ট বেঞ্চারটার কাছে, সেই ভালো ছেলেটার কাছে, তার চোখে জল...ঠোঁটে অভিব্যক্তি, "কেনো করলে এরকম...বলো"...
জীবনের ফুটবল ম্যাচ কাউকে ফিরতে দ্যায়, কাউকে দেয় না...কেউ সুশান্ত হয়, কেউ অশান্ত... আমি লড়ে চলেছি, ফিরে এসেছি, তবে লড়াই এখনো বাকি, অতীতকে ধুয়ে মুছতে পারবো না, তবে নতুন করে খারাপ না করে, যদি কাউকে জীবনে ফিরিয়ে আনা যায়...যদি কাউকে বলা যায়, যে,"তুমি কিন্তু এটা নও, তোমার অন্তরের মানুষটাকে চেনো"...যদি আমার জন্যে একজনও বদলাতে পারে...তাহলে সেটাই সেই হেরে যাওয়া, আয়নার সামনে মাথা নিচু করে বসে থাকা ছেলেটা হয়তো জিতে যাবে...সে আজকে চেঁচিয়ে বলছে, "আমি ফেরার চেষ্টা করছি, ওই ভালো ছেলেটার মত হবার চেষ্টা করছি, আমাকে একটু হেল্প করো..." যখন কেউ কোনো কথা শুনে ,কোন ভিডিও দেখে বলে "তোমার জন্য জীবনে ফিরলাম", কেউ যখন বলে, "আত্মহত্যা করে ফেলতাম তুমি না থাকলে"...কেউ যখন বলে ,"আমার বই বেরিয়েছে, শুধু তুমি পাশে ছিলে বলে, নইলে মরেই যেতাম"...তখন মনে হয় বলি, চেষ্টা, আমি করেছি, ভুল, আমিও করেছি, বাজে কথা, আমিও বলেছি, তবে আমি ফিরে এসেছি, বাকিরা নেবে কিনা জানিনা, বাকিরা কাছে রাখবে কিনা জানিনা, বাকিরা থুতু দেবে কিনা জানিনা, তবে আমি চেষ্টা করে যাচ্ছি, ডাক্তার ওষুধ নিজের চেষ্টা কিস্যু বাদ দিই নি...আমি পারলে...তুমিও পারবে...
শুধু আমার অতীতটা দেখো না...আমার বদলে যাওয়া মানুষটাকে দেখো, যদি এটা দেখে আরো কেউ বদলানোর সাহস পায়...ভালো হবার চেষ্টা করে...ধাক্কা দিয়ে দিলে সে কিন্তু আবার পড়ে যাবে...বাকিরা চেষ্টা করতেও ভয় পাবে...এই ফেরার চেষ্টাটা যেন তোমাদের হাতটুকু পায়...
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন